এক ফেলুদা,
দুই সত্তা
প্রতীক
মহাপাত্র
"পাঁচ
ভাই, এক সাথ
মারছে
ঘুষি, খাচ্ছে ভাত।
আরও
পাঁচ সাথে তার
কেমন
আছেন? নমস্কার।"
কথাগুলি কিন্তু বাঙালির অন্যতম
সেরা 'মগজাস্ত্র' প্রসূত। তবে আপামর বাঙালির আবার মগজাস্ত্রের তুল্যমূল্য বিচারে কোনও
বিরাম বিশ্রাম নেই। আসলে কিছু অনুষঙ্গ আমাদের ব্যক্তিমানসে ও জীবনচর্যায় এতটা ওতপ্রোতভাবে
জড়িত যে সেগুলিকে বাদ দিয়ে নিজেদের অস্তিত্বকে কেমন একটা ফিকে মনে হয়। কিছু কিছু বিষয়ে
বাঙালির মধ্যে চিরকালীন একটি বিতর্কের রেশ এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে চলতেই থাকে।
যেমন উত্তমকুমার না সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, হেমন্ত মুখোপাধ্যায় না মান্না দে, মোহনবাগান
না ইস্ট বেঙ্গল- তর্কপ্রিয় বাঙালির বাদানুবাদের অন্ত নেই কে সেরা তার লড়াই নিয়ে। এবার
সিনেমাপ্রেমীদের (বলা ভালো, সচেতন সিনেমাপ্রেমীদের) কাছে তর্কের আর একটি বিষয় হলো ফেলুদার
চরিত্রে কে বেশি মানানসই? সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় না সব্যবাচী চক্রবর্তী? এক চরিত্রের
দুই চিত্রণ। দু'জনেই অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক, স্বনামধন্য অভিনেতা এবং মানুষ আলাদা আলাদা
দৃষ্টিকোণ থেকে দু'জনকেই আপন করেছে। সত্যি বলতে, প্রথিতযশাদের এভাবে তুল্যমূল্য বিচার
হয়না। হয়তো সেই প্রথাগত ভাবধারাকে নস্যাৎ করতেই আজ কলম ধরা! নানান প্রসঙ্গের বিচার-বিশ্লেষণে
যাওয়ার আগে বর্ষীয়ান সাহিত্যিক ও পরিচালক অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়ের কয়েকটি কথায় আসি। একটি
একান্ত সাক্ষাৎকারে অরবিন্দ মুখোপাধ্যায় জানিয়েছেন- "আমি যখন সিনেমা জগতে আসি,
আমার দাদা (সাহিত্যিক বনফুল) বলেছিলেন, যাই করিস তুই শিশির ভাদুড়ীর থিয়েটারটা দেখতে
ভুলিসনা। দাদার কথামতো শ্রীরঙ্গমে প্রতি শনিবার শিশিরবাবুর চন্দ্রগুপ্ত নাটক দেখতাম।
পরে পরিচয় হলে উনি আমাকে ফ্রি পাসের ব্যবস্থা করে দেন। যাইহোক রবিবার সকালে চলে যেতাম
কৈলাস বসু স্ট্রিটে পরিমল গোস্বামীর বাড়িতে। ওঁর বাড়ির লাইব্রেরির প্রতি অনেকের আগ্রহ
ছিল। আমি যেতাম বিদেশি সাহিত্যের লোভে। আর শিশিরবাবুও আসতেন বই নিতে। একদিন দেখা হয়ে
গেল। শিশিরবাবু বললেন, 'গতকাল শো দেখেছ নাকি?' বললাম, দারুণ হয়েছে। যতবার দেখি মুগ্ধ
হই। হঠাৎ গম্ভীর হয়ে শিশিরবাবু বল উঠলেন, 'তুমি তো দানীবাবুর (অভিনেতা সুরেন্দ্রনাথ
ঘোষ, ১৮৬৮-১৯৩২) চন্দ্রগুপ্ত দেখনি! আমি তাঁর পঁচিশ পারসেন্টও পারিনি।' আমি তো হতবাক।
শিশির ভাদুড়ী একথা বলছেন!" পরে আরও মর্মস্পর্শী অনেককিছুই ঘটে। দানীবাবু অভিনীত
চন্দ্রগুপ্তের কিছু অংশ শিশির ভাদুড়ী বাদ দেন, ও প্রসঙ্গত একথাও বলেন যে চন্দ্রগুপ্তের
মতো একজন প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব শুধুমাত্র নিজের মেয়ের জন্য আবেগপ্রবণ হবেন, তা তাঁর
কাছে কিছুটা অতিরঞ্জন বলে মনে হয়েছিল। রংমহলে ব্যক্তিগত আলাপচারিতার পর যখন শিশির ভাদুড়ীর
অনেক অনুরোধ-উপরোধ সত্ত্বেও দানীবাবু তাঁর নাটক দেখতে যেতে একপ্রকার অসম্মত হলেন ও শ্রী
ভাদুড়ী ব্যর্থ মনোরথ হয়ে ফিরে আসছেন, তখন হঠাৎই, 'শিশিরবাবু, আমি যাব,' শুনে আবার তিনি
পড়ি কি মরি করে তাড়াহুড়ো করে ছুটে এলেন। এই ভাববিহ্বলতার দৃষ্টিকোণ থেকেই দানীবাবু
শিশির ভাদুড়ীকে বোঝালেন যে চন্দ্রগুপ্ত যতই প্রভাবশালী আর ওজস্বী ব্যক্তিত্বই হন না
কেন, তিনিও তো একজন বাবা। তিনি কেন পারেননা তাঁর বহু বছর যাবৎ নিখোঁজ মেয়ের সন্ধান
পেয়ে আবেগপ্রবণ হতে? আবেগ তো সহজাত। একটিই চরিত্র- চন্দ্রগুপ্ত। দু'জন খ্যাতনামা অভিনেতা
সেই চরিত্র-চিত্রণে মঞ্চে অবতীর্ণ। আলাদা আলাদা তাঁদের ভাবমূর্তি। তুল্যমূল্য বিচারটা
দর্শকের হাতে।

সত্যজিৎ রায়ের সৃষ্টি এবং আট থেকে আশি, সকলের প্রিয়
গোয়েন্দা ফেলুদা ওরফে প্রদোষচন্দ্র মিত্রকে বাঙালি আরও সরাসরি চিনতে পেরেছে মূলত দু'জন
অভিনেতার মাধ্যমে- সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় এবং সব্যসাচী চক্রবর্তী। ফেলুদাকে নিয়ে প্রথম
তৈরি সিনেমা 'সোনার কেল্লা' (১৯৭৪), পরিচালক ফেলুদার স্রষ্টা নিজেই। ফেলুদার চরিত্রে
সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। গোয়েন্দাকাহিনিপ্রেমী অনেকেই একটি বিষয়ের সাথে সহমত হবেন হয়তো,
যে বেশিরভাগ গোয়েন্দা চরিত্রগুলির আচরণে ও মননে সবসময় প্রচ্ছন্ন একটা চিন্তাভাবনার
চোরাস্রোত বইতে থাকে, যা আমরা গল্পের পাতায় ভিস্যুয়ালাইজ করলেও যতক্ষণ না পর্যন্ত চরিত্রটি
অভিনয়ের মাধ্যমে আমাদের কাছে ফুটে উঠছে, ততক্ষণ পর্যন্ত আমাদের কল্পিত দৃশ্যপট অসম্পূর্ণই
থাকে। একটা বিষয় নিশ্চিত যে দু'জন অভিনেতার অভিনয় দেখার পরও আমরা যখন ফেলুদাকে আবার
গল্পের ঘটনাপ্রবাহে ফিরে পাই, তখন এঁদের কারও না কারও মুখই ভেসে ওঠে। তা সৌমিত্রবাবুরও
হতে পারে, কিংবা সব্যসাচীবাবুর। দৃশ্যকল্পে কাকে ভাবছি, তা নির্ভর করছে এই নির্দিষ্ট
চরিত্রে কার অভিনয় আমাদের মনকে বেশি নাড়া দিয়েছে। যখন 'সোনার কেল্লা'-য় প্রথম সৌমিত্র
চট্টোপাধ্যায়ের আত্মপ্রকাশ ফেলুদা হিসেবে, ওই সময়ের সমসাময়িক দর্শক ও বিশ্লেষকের চোখে
সৌমিত্রবাবুই ছিলেন আপাদমস্তক বাঙালিয়ানায় ভরপুর ফেলুদাকে বুদ্ধিদীপ্ত ভাবে ফুটিয়ে
তোলার এক এবং অদ্বিতীয় মুখ। প্রথাগত রোম্যান্টিক নায়ক থেকে থেকে 'ঝিন্দের বন্দী'-র
খল চরিত্র ময়ূরবাহন। নানান মাত্রাতেই ওই সময়ের মধ্যে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে পাওয়া
দর্শকের একটুও অসুবিধা হয়নি তাঁকে পরিচিত ঘরানার বাইরে একটি চরিত্রে দেখতে। অন্যদিকে,
সত্যজিৎ রায়রই 'অপুর সংসার' এবং 'অপরাজিত'-র অপু হিসাবে তখন তাঁর নাম সুপ্রতিষ্ঠিত।
একই ভাবে 'সোনার কেল্লা'র পর যখন 'জয় বাবা ফেলুনাথ' (১৯৭৯)-এ সৌমিত্রবাবু দ্বিতীয়বার
ফেলুদার চরিত্রে অবতীর্ণ, তখন ফেলুদা আর সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়- দু'টি নামই দর্শকের
কাছে সমার্থক। কোনও ভেদাভেদ করে ভাবার অবকাশই রাখেননি সত্যজিৎ। 'সোনার কেল্লা'-য় জয়পুরের
ওয়েটিং রুমে ফেলুদার বিছানায় শঠ ও তকমাধারী ভুয়ো ভূপর্যটক মন্দার বোস (কামু মুখোপাধ্যায়)
কাঁকড়াবিছে ছেড়ে দেওয়ার পর কাঁচের গ্লাস চাপা দেওয়ার দৃশ্যে সৌমিত্রবাবুর ক্ষিপ্রতা অতুলনীয়।
এবং তারপরেই, "তোপসে, দেখে যা। এ জিনিস এতো কাছ থেকে দেখার সুযোগ আর পাবিনা।"
এক মুহূর্তের তাৎক্ষণিক দ্রুতির পরের মুহূর্তেই চকিত পর্যবেক্ষণ! এই চিত্রণের এই ডাইনামিক্সেই
সত্যজিতের সার্থকতা। এর পর ঘটে চলে একের পর এক অনবদ্য পর্যায়ক্রম, যা ধীরে ধীরে সমস্ত
জট খুলে সমস্যাকে সমাধানের পথে উপনীত হতে পথ করে দেয়। 'জয় বাবা ফেলুনাথ'-এ ঘোষালবাড়ির
চিলেকোঠায় রুকুর সঙ্গে ফেলুদার ছড়া বিনিময়ের (ক্যাপ্টেন স্পার্ক বললে বোধ হয় আরও বেশি
রোমাঞ্চ ফুটে ওঠে, এই ছড়া দিয়েই লেখার অন্দরে প্রবেশ করেছিলাম) সময় রুকু জানায় অ্যান্টিক
গণেশটি আছে 'আফ্রিকার রাজা'-র কাছে। অর্থাৎ দুর্গাঠাকুরের সিংহের মুখে। লক্ষ্যণীয় এই
যে, 'জয় বাবা ফেলুনাথ'-এর এই সিকোয়েন্সগুলিতে বাঙালির অন্যতম প্রিয় একটি বিষয় মজ্জায়
মজ্জায় নিহিত, তা হলো ধাঁধা। ধাঁধার জেরে গল্পের প্লটে এসেছে গতি। ধাঁধাই খুলেছে রহস্যের
বেড়াজাল। অপূর্ব বাঙালিয়ানায় অনুপম সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর অভিনীত ফেলুদার দু'টি
ছবিতেই। সঙ্গে আর একজনের নাম উল্লেখ না করলে চরম অবিচার করা হয়- জটায়ু ওরফে লালমোহন
গাঙ্গুলির চরিত্রে সন্তোষ দত্ত। অদ্বিতীয়! বলতে গেলে ফেলুদার স্বভাবসিদ্ধ সিরিয়াসনেসের
উপযুক্ত দোসর জটায়ুর কৌতূকময় লঘু বাক্যালাপ। যদি বলা হয়, মগনলাল মেঘরাজের (উৎপল দত্ত) বৈঠকখানায়
অর্জুনের ছুরির কেরামতির আগের ও পরের দৃশ্যে সন্তোষবাবু তাঁর জটায়ু-চরিত্রের অভিনয়ের
শিখরে সাথান করে নিয়েছেন, বোধ হয় তা অত্যুক্তি হবেনা। দু'টি ছবিতেই সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়
ও সন্তোষ দত্ত- এই নাম দু'টি ভীষণভাবে সম্পৃক্ত, প্রাসঙ্গিক ও জনপ্রিয়।


১৯৮৮ সালে সন্তোষ দত্তের মৃত্যুর পর সত্যজিৎ সিদ্ধান্ত নেন যে তিনি ফেলুদাকে নিয়ে আর ছবি করবেননা।
১৯৯৪ সালে সত্যজিৎ-পুত্র সন্দীপ রায় তখন উদীয়মান চিত্রপরিচালক। তাঁর পরিচয় হয় সব্যসাচী
চক্রবর্তীর সাথে। ১৯৯৬ থেকে ২০০০ সালের মধ্যে 'সত্যজিতের গপ্পো' বলে টেলিভিশন সিরিজে
সব্যসাচী দশটি গল্পের আধারে নির্মিত টেলিফিল্মে সব্যসাচী ফেলুদার চরিত্রে অভিনয় করেন।
সাল অনুযায়ী পর পর সাজালে গল্পগুলি হলো- ১৯৯৬-য়ে 'বাক্স রহস্য', 'গোঁসাইপুর সরগরম',
'শেয়াল দেবতা রহস্য'; ১৯৯৭-য়ে 'বোসপুকুরে খুনখারাপি', 'যত কাণ্ড কাঠমাণ্ডুতে', 'জাহাঙ্গীরের
স্বর্ণমুদ্রা', 'ঘুরঘুটিয়ার ঘটনা' (তোতাপাখির "ত্রিনয়ন, ও ত্রিনয়ন, একটু জিরো"
তেই সিন্দুকের লকারের নম্বর 39039820-র সমাধান, সে কি ভোলা যায়?); ১৯৯৯-য়ে 'গোলাপি
মুক্তো রহস্য' এবং 'অম্বর সেন অন্তর্ধান রহস্য' এবং ২০০০ সালে 'ড. মুন্সীর ডায়েরি'।
দশটি টেলিফিল্মে ফেলুদার চরিত্রে অভিনয়ে পর ২০০৩ সালে আবার সন্দীপ রায়ের হাত ধরে ফেলুদা
এলেন বড়ো পর্দায়। নিয়ে এলেন নতুন ফেলুদা সব্যসাচী চক্রবর্তীকে। 'জয় বাবা ফেলুনাথ'-এর
তেইশ বছর পর ফেলুদা আবার বড়ো পর্দায়! দাপুটে, লম্বা গড়ন ও ভরাট কণ্ঠস্বরে ফেলুদার আত্মপ্রকাশ
যেন একেবারে সমসাময়িক। আটপৌরে বাঙালিয়ানা না থাকলেও এই ফেলুদা বেশ অন্যরকম। বুদ্ধিদীপ্ততার
সাথে জুটি বাঁধলো অ্যাকশনধর্মীতা। প্রতিপক্ষের সাথে কথা বলায় এলো তুলনাবিহীন স্মার্টনেস।
ফেলুদার চরিত্রে মানানসই হতে বেশি সময় লাগেনি সব্যসাচী চক্রবর্তীর। "দৃষ্টি আর
মস্তিষ্ক- এই দু'টোকে সজাগ রাখলে অনেককিছুই অনুমান করা যায় লালমোহনবাবু।" আমাদের
ফেলুদার আরও কনটেম্পোরারি নোশন্ অনুভব করালেন সব্যসাচী।

২০০৭-এ আবার সন্দীপ রায়ের হাত ধরেই তিনি বড়ো পর্দায়
দ্বিতীয়বার ফেলুদার চরিত্রে। এবার 'কৈলাসে কেলেঙ্কারি'। এখানে 'বোম্বাইয়ের বোম্বেটে'-র
আনকোরা ভাব একেবারেই নেই। বরঞ্চ অনেক বেশি পরিণত এবং আকর্ষণীয়। এই প্রসঙ্গে অভিনেতা
হারাধন বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি সাক্ষাৎকারে একটু চোখ ফেরানো যাক- "বাবুর (সন্দীপ
রায়) পরিচালনায় আমি বেণুর (সব্যসাচী চক্রবর্তী) সঙ্গে কাজ করেছি 'বাক্স রহস্য' আর
'কৈলাসে কেলেঙ্কারি'তে। 'কৈলাসে কেলেঙ্কারি' হলে দেখতে গিয়ে প্রথমে সিটে হেলান দিয়ে
বসে ছিলাম কিন্তু খানিক্ষণ বাদেই শিরদাঁড়া সোজা করে বসতে হল এবং ছবি শেষ হওয়া পর্যন্ত
আমি আর আয়েস করে বসতে পারিনি। বাবুর পরিচালনার এমনই গুণ। ও ছবিটাকে আধুনিক ও যুগোপযোগী
করে বানিয়েছে।" হারাধন বন্দ্যোপাধ্যায় আরও বলেন, "ফেলুদা হিসেবে বেণুও দর্শকমহলে
সমাদৃত, বলা যেতে পারে ওয়েল অ্যাক্সেপ্টেড, 'কৈলাসে কেলেঙ্কারি' চলেছেও ভালো। কিন্তু
ফেলুদার কাহিনি আমি যতটুকু পড়েছি তাতে ফেলুদার যে ছবি আমার মনে গেঁথে আছে তাতে একটা
ফারাক, কোথাও একটা খামতি আমি পাচ্ছি। আমার এই বিশ্লেষণ হয়তো ভুল, হয়তো আমার দৃষ্টিভঙ্গী
ঠিক নয়, তবু বলি, মূল যে ফারাকটা আমার চোখে পড়ছে তা হলো বয়স, বয়সটা বেশি হয়ে যাচ্ছে।
ফেলুদা অতটা লম্বা! চেহারার কাঠিন্য, চাপা গাল, মুখময় দাগ- এসবই ফেলুদার চরিত্রের পরিপন্থী।"
হারাধনবাবু তাঁর ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণের কথাই বলেছেন। এমনভাবেই কে কতটা এগিয়ে তার তুল্যমূল্য
বিচার চলতেই থাকে। কিন্তু আলোচ্য ছবির নিরিখে কয়েকটি কথা বলতে গিয়ে সেই ছবির ও ছবির
আধার মূল কাহিনির দৃশ্যপটের একটু কাটাছেঁড়া করা যাক। দেখা যাক তুল্যমূল্যের যুযুধান
দু'পক্ষ কিছুটা হলেও স্তিমিত হয় কি না। তদন্তের স্বার্থে ছদ্মবেশ ধরে তোপসেকে গল্পে
ফেলুদা বলেছিলেন, "বাংলা জানি এটুকু বলে রাখছি। নাম জানার দরকার নেই। পেশা ফটোগ্রাফি;
হংকং-এর এশিয়া ম্যাগাজিনের জন্য ছবি তুলতে এসেছি (লালমোহনবাবুর কথায়, "চুংকিং-এর
কী একটা পত্রিকার জন্য")।" আবার সিনেমায় বলতে শোনা গেছে "তোদের সঙ্গে
আমার আলাপ নেই। তুই আর লালমোহনবাবু একসঙ্গে এসেছিস। আমি আলাদা। তোরা থাকবি এক ঘরে।
আমি অন্য ঘরে। ... বাংলা জানি ব্যস্। নাম জানার দরকার নেই। পেশা ফটোগ্রাফি। ন্যাশনাল
জিওগ্রাফিকের জন্যে ছবি তুলতে এসেছি।" একই অনুষঙ্গ, আলাদা প্রকাশ। বরঞ্চ সিনেমারটা
আরও বেশি জোরদার। সময়ের সঙ্গে তো আবেদনে পরিবর্তন তো আসবেই! কাজেই পরিচালক বীরেশ চট্টোপাধ্যায়ের
অভিমত, "আমার মনে হয় সত্যজিৎ রায়ের ফেলুদার মধ্যে বাঙালিয়ানা ব্যাপারটা ভীষণভাবে
রয়েছে। যেটা সন্দীপ রায়ের ফেলুদার মধ্যে তেমনভাবে নেই। বর্তমান ফেলুদা ভীষণ বুদ্ধিদীপ্ত,
তীক্ষ্ণবুদ্ধিসম্পন্ন স্ট্রং কমন সেন্সের অধিকারী। কাজ নিয়ে তিনি সবসময় মগ্ন হয়ে থাকেন।
এফিসিয়েন্ট, ভীষণ স্মার্ট কিন্তু কম কথা বলেন, আড্ডা মারেন না এবং হাসি ঠাট্টা কম করেন।
ফলে এই ফেলুদাকে দর্শকরা সম্মান করেন, সমীহ করেন। ফলে সৌমিত্রদার ফেলুদার মতো সব্যসাচীর
ফেলুদা দর্শকের ততটা কাছের মানুষ হয়ে উঠতে পারেননি বলেই মনে হয়।" কিছু সুনির্দিষ্ট
শব্দচয়নের জন্য আমার এই অভিমতটিকে ভীষণ বেমানান মনে হয় বীরেশ চট্টোপাধ্যায়ের মতো একজন
কৃতী পরিচালকের মুখে। প্রথমত, বাঙালি মানেই কি তার কাজপাগল হওয়া সাজেনা? স্মার্ট আর
এফিসিয়েন্ট সত্তার সাথে বাঙালির ফতুয়া-পাজামা পরা নাদুসনুদুস গোলগাল ভাবমূর্তিটাই যেন
একটা বিপরীত মেরুতে এসে অবতীর্ণ হয়েছে! বাঙালি মানেই তাকে "মাথায় ছোটো, বহরে বড়ো"
তর্কবাগীশই হতে হবে! কাজপাগল ও এককেন্দ্রিক হলেই আদ্যিকালের সেন্টিমেন্টে এসে ঘা লাগবে!
আমার তো কিছু ক্ষেত্রে উলটোটাই মনে হয়। 'টিনটোরেটোর যীশু' (২০০৮), 'গোরস্থানে সাবধান'
(২০১০) বা 'রয়েল বেঙ্গল রহস্য' (২০১১)-র ফেলুদা অনেক বেশি সময়োপযোগী ও প্রাসঙ্গিক!
লালমোহনবাবুর সাথে নিজের বৈঠকখানায় চায়ের আসরে শিকারি মহীতোষ সিংহরায়ের বীরদর্পের
অনুষঙ্গ আলোচনায় জিম করবেট ও কেনেথ অ্যাণ্ডারসনের প্রসঙ্গ আনয়নে সব্যসাচী চক্রবর্তী
ছাড়া অন্য কোনও মুখ কল্পনা করতেই অসুবিধা হয় (তাঁর ব্যক্তিগত অরণ্যপ্রাণ আগ্রহের জায়গাকে
জোর দিয়ে কোনওভাবেই মন্তব্যটি করলাম না), এতটাই সংলাপগুলিকে স্বাভাবিকতার মোড়কে তিনি
পরিবেশন করেছেন।

কিছুমাস আগে প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটির এক জুনিয়রকে
বলতে শুনেছিলাম যে দুই সময়ের দর্শক দু'জন চরিত্রাভিনেতাকে আলাদা মাত্রার ভিত্তিতে গ্রহণ
করেছেন এবং গ্রহণীয় হয়েছেন দু'জনেই! কেউ কারও থেকে এগিয়ে বা পিছিয়ে নেই, নেই কোনও শ্রেষ্ঠত্বের
ব্যবধান। একটি উদাহরণ দিয়ে কথা শেষ করবো। সাহিত্যের ছাত্রছাত্রীদের কাছে অ্যারিস্টটলের
'পোয়েটিক্স' এক অতি পরিচিত নাম। অ্যারিস্টটল তাঁর সময়ে ট্র্যাজেডির যে সমস্ত গুণাবলী
থাকা অত্যাবশ্যকীয় বলে মনে করেছিলেন, সেই ভাবধারার আমূল পরিবর্তন হয় এলিজাবেথীয় যুগে
কৃতী ইউনিভার্সিটি উইস্ এবং শেক্সপীয়রের হাত ধরে। পরে আমরা জন অসবোর্ন, বার্নাড শ',
এলিয়ট এবং আর্থার মিলারের ট্র্যাজিক নায়কের বৈশিষ্ট্যে ও উপস্থাপনায় আরও সময়োপযোগী
দিকের সমাহার পাই। তাঁর মানে কি অ্যারিস্টটল একাই সর্বৈব সত্য? তাঁর সময়ের ভিত্তিতে
লিপিবদ্ধ বিশেষত্বগুলির প্রাধান্য ছিল। কিন্তু কয়েক হাজার বছর পর সেই বিশেষত্বগুলির
পরিবর্তন ঘটা যেমন স্বাভাবিক, তেমনই এক চরিত্রের আলাদা আলাদা দু'টি ঘরানা গড়ে ওঠাও
একই ভাবে প্রাসঙ্গিক। সেখানে স্টিরিওটাইপ দিয়ে বিচার করলে হয়না কখনওই। জেমস্ বণ্ডের
চরিত্রেও শন কনারি এবং ড্যানিয়েল ক্রেগকে নিয়ে একই ধরনের বৈরিতার সৃষ্টি হয়েছিল। কিছু
সময়ের জন্য অভিনয় করেছিলেন রজার মুর। অভিনেতা বদলের ফলে বণ্ডের সিনেমার জনপ্রিয়তা ক্ষুণ্ণ
হয়নি এতটুকুও। ফেলুদার চরিত্রের ক্ষেত্রেও বিষয়টা অনেকটাই সেরকম। ফেলুদার প্রকৃত অস্তিত্ব
সাহিত্যে। সিনেমা এক অনবদ্য দোসর সাহিত্যের। কাজেই কে কীভাবে ভিস্যুয়ালাইজ করছে একটি
চরিত্রকে, তা সম্পূর্ণভাবে পাঠকের ওপর নির্ভরশীল। আর সমালোচনাও দর্শকের ব্যক্তিগত আঙ্গিকের
ওপর আধারিত। তা কখনোই চূড়ান্ত বলে বিবেচিত হতে পারেনা। অনেকে বলেন সত্যজিৎ রায় ফেলুদার
প্রতিটি গল্প লেখার সময় সৌমিত্রবাবুর কথা মাথায় রেখেই লিখতেন। যদিও প্রচ্ছদ ও অলংকরণে
ফেলুদাকে আমরা যেভাবে দেখি, সেই ভাবমূর্তির সাথে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের আটপৌরে বাঙালিয়ানার
মিল ততটা নেই। তীক্ষ্ণতার ছাপ আছে সেই অলংকরণে। সব্যসাচী চক্রবর্তীর অভিনয়ে পরতে পরতে
ফুটে ওঠে সেই তীক্ষ্ণতা (তাঁর রোম্যান্টিক নায়ক হিসেবে আত্মপ্রকাশ না করার কারণে তিনি
নিজে বিশ্লেষণ করেছেন এভাবে যে তাঁকে গাছ ধরে গান করার স্মৃতিমেদুর দৃশ্যে মানায়না
আর ফেসিয়াল এক্সপ্রেশনের কথা বলতে গেলে তো বলতেই হয় সত্যজিতের নিজের মুখের গড়নের সাথে
সব্যসাচীর গড়ন অনেকটাই মিলে যায়)। একটি বিষয় খুবই স্পষ্ট, সার্থক পরিচালকের হাত ধরে
ফেলুদা আবার পর্দায় ফিরলে চরিত্রাভিনেতা বদলাতেই পারে। আসবেন নতুন মুখও। কিন্তু তাতে
ফেলুদার নিজের ঘরানা ও সত্তার কোনও পরিবর্তন ঘটবেনা। নিছক তুল্যমূল্য বিচার করাটা নিজেদের
স্টিরিওটাইপের মধ্যে বেঁধে ফেলা হয়। তাতে ফেলুদার একক স্বাতন্ত্র্য বদলায়না।


"ফেলুদার চরিত্রে সৌমিত্রর
সাথে সব্যসাচীর কতটা তুলনা চলতে পারে" শীর্ষক অনুলিখনধর্মী সাক্ষাৎকার থেকে উল্লিখিত
উদ্ধৃতিগুলি নেওয়া হয়েছে। সাপ্তাহিক বর্তমান, ৯ ফেব্রুয়ারি, ২০০৮।
ছবি সূত্রঃ - Google
© 2020 প্রতীক মহাপাত্র